Sat. Jan 25th, 2020

Sylhetnews71live

Online News Paper

নারী নির্যাতন আর নয়

1 min read

অমিতা বর্দ্ধন


সমুদ্রে যেমন একটি ঢেউ এসে আরেকটি ঢেউকে ধাক্কা দিয়ে ম্লান করে দেয়, সে যতই বড়ো হোকনা কেন, তেমনি সমাজ সমুদ্রেও এক একবার একটা একটা করে এমন সব ঢেউ উড়ে আসে যাকে সামাল দেওয়া বা দমানো খুবই কঠিন হয়ে পড়ে। তবে সমাজ, রাষ্ট্র বা জাতি যদি একই লক্ষে কাজ করা যায় তবে যত কঠিন সমস্যাই হোকনা কেন সার্থকতা অনিবার্য। হ্যাঁ যাকে নিয়ে এতগুলি লিখা-সেটা যৌন হয়রানি। এই যৌন হয়রানি এখন সামাজিক সমস্যায় আটকিয়ে রাখা যাচ্ছে না, বাঁধ ভেঙে জাতীয় সমস্যায় রুপান্তরিত হচ্ছে। এত প্রবল বেগে ধেয়ে আসছে যেন আইলা, সুনামী, নার্গিস ইত্যাদির মতই। এই সমস্ত প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোকে যেমন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিহত করা হয়েছে, ঠিক তেমনিভাবে এই যৌন হয়রানি ব্যাধিকেও প্রতিহত করতে হবে খুব জুড়ালোভাবে।
ক্যান্সার রোগটি যেমন প্রাথমিকভাবে ধরা পড়লে প্রতিহত করা সম্ভব তেমনি যৌন হয়রানি যদি প্রাথমিক অবস্থায়ই অত্যন্ত শক্তভাবে প্রতিকারের ব্যবস্থা নেওয়া যেত তাহলে অক্টোপাসের মতো জাতিকে আঁকড়িয়ে ধরে রাখা সম্ভব হতো না। কয়েকটি ঘটনায়ই যদি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান করা হতো তাহলে আজ এই নোংরা ব্যাধিটি এত মাথাচাড়া দিয়ে উঠতো না।
আমি কয়েকটি ঘটনা শ্রদ্ধেয় পাঠক মহলে তুলে ধরছি-
আর্থিক অস্বচ্ছলতার কারণে বাবা-মা দুজনেই চাকরি করতে হয়। তাই আট বছরের ছোট্ট মেয়েটিকে ভাইয়ের কাছে রেখে গিয়েছিল। কিন্তু সেই ছোট্ট মেয়েটি সেদিন রেহাই পায়নি মানুষরূপী নরপশুদের লালসার কবল থেকে। কেড়ে নিল মেয়েটির সতীত্বকে। নরপশুরা তার পরও ক্ষান্ত হয়নি। বৈদ্যুতিক পাখার সাথে ঝুলিয়ে রাখল হত্যা করে। কী অপরাধ করেছিল সেই ফুলেল মমত পবিত্র শিশুটি? কেনই বা সে এসেছিল এই নশ্বর পৃথিবীতে? অপরাধ সে মেয়ে হয়ে জন্মেছিলো। নামটি বাবা মা আদর করে রেখেছিল ময়না। তাকে বাবা-মার স্নেহের খাঁচা থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য করা হল।
২০১০ সালে ২৫শে মার্চ দৈনিক সমকালে ছাপা হল-মেয়ে বিয়ে করতে রাজী না হওয়ায় বখাটেরা মেয়ের সামনে বাবা-মাকে গুলি করে হত্যা করল। একই সালে ২৮শে মার্চ যুগান্তরে জানা গেল-প্রেম প্রস্তাবে রাজী না হওয়ায় বান্ধবী ও তার বাবা-মাকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়েছে ভার্সিটির এক বখাটে পশু। প্রেম প্রস্তাবে রাজী না হওয়ায় গাইবান্ধায় সবার সামনে পেটালো দশম শ্রেণির এক ছাত্রীকে।
অন্যদিকে মুন্সীগঞ্জের শ্রী নগরে বাড়েখালি উচ্চ বিদ্যালয়ে দশম শ্রেণির মেধাবী ছাত্রী বখাটেদের প্রতিরোধ কর্মসূচিতে প্রথম সারিতে ছিল বলে অত্যাচারিত হয়ে শেষ পর্যন্ত আত্মহননের পথ বেছে নিলো। নাম ছিল হাসনা রহমান সিনথিয়া। গত ২৮শে অক্টোবর মেয়েকে উত্যক্তকারীর হাত থেকে বাঁচাতে গিয়ে ঘাতক দেবাশীষ সাহা রনির মোটরসাইকেলের চাপায় পিষ্ঠ হয়ে মারা যান চাঁপা রানী ভৌমিক (৪৮)। নাটোরের লোকমানপুর কলেজের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক মিজানুর রহমানকেও প্রাণ দিতে হল কলেজের ছাত্রী উত্যক্তকারীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায়। (তথ্যসূত্র : গত ২৩/১০/২০১০, দৈনিক আমাদের সময়)
শুধু এই গুটিকয়েক ঘটনার অবতারণার মধ্যেই যৌন হয়রানি বা অশ্লীল আচরণ সীমাবদ্ধ নয়। এরকম শতশত ঘটনা হচ্ছে। কিছু মিডিয়ায় এসেছে আর কিছু রয়েছে পর্দার আড়ালে যা কেউ কোনোদিন জানতে পারবে না। কারণ তারা অসহায়, পথহারা নিষ্পাপ জীবন। এইসব অকালে ঝরে পড়া প্রদীপগুলো নিভৃতে নির্জনে কেঁদে মরছে। এই নরপশু, নর্দমার কিটরা আরও কতো অগণিত মেয়েকে এসিড মেরে ঝলসিয়ে দিয়েছে তার অবয়ব। আগুনেও আত্মাহুতি দিতে হয়েছে কতো নারীকে তার হিসাব রাখা সম্ভব নয়। বাধ্য করা হচ্ছে আত্মহত্যার পথকে বেছে নিতে। কিন্তু কে বলে দেবে-হে নারী, রুখে দাঁড়াও!
এক পরিসংখ্যানে জানা গেছে গত সাত বছরে বখাটেদের নির্যাতনের শিকার হয়েছে ৪১২০ জন নারী এবং তারা প্রায় সকলেই আত্মহত্যার বলিদান। মামলা হয়েছে এযাবৎ প্রায় ১৫০টি আর সাধারণ ডায়েরি হয়েছে ৩৭৭টি, ১২৬৯ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে, আবার পুলিশ গ্রেফতার করেছে ৫২০ জনকে। পুলিশ সদর দপ্তরের সূত্র মতে প্রায় ৫৩ জাহার ৫৮ জনকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়েছে আর বাকী ২৯ হাজার ৮১১ জন বিশ খেয়ে আত্মহত্যায় নিজেকে জলাঞ্জলী দিয়েছে।
দেশ যখন তথ্য প্রযুক্তির দিকে এগোচ্ছে, শিক্ষা ক্ষেত্রে অভাবনীয় সাফল্য লক্ষ করা যাচ্ছে, সরকার বাংলাদেশকে ডিজিটাল পদ্ধতির দিকে ধাবিত করছে, বাংলাদেশ বিশ্বের কাছে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছে তন্মেধ্যে নানা সমস্যা-বিদ্যুৎ-গ্যাস, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে দেশ জর্জরিত। ঠিক তখন এই উটকো ঝামেলা এমন রূপ পরিগ্রহ করেছে যে যৌন হয়রানি একটা সংক্রামক ব্যাধির ন্যায় সমাজের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছে। আজ সেটা সামাজিক সমস্যা ছাড়িয়ে জাতীয় সমস্যায় রূপ নিয়েছে। সামাজিক সমস্যাকে সামাজিকভাবেই মোকাবিলা করা উচিত। কিন্তু যথার্থ আইনের প্রয়োগ সরকারকে নিতে হবে এবং অত্যন্ত কঠোরভাবে। যথার্থভাবে প্রয়োগ হলে বখাটেপনা, যৌন হয়রানি এমনিতেই বাধাগ্রস্ত হয়ে পড়বে।
প্রত্যেক পাড়ায় পাড়ায় সুশীল বা গুণী ব্যক্তিবর্গ মিছিল মিটিং বা আলোচনা সভা করে জোর প্রতিবাদ করা উচিত। প্রত্যেক পরিবারে অভিভাবকরা যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে পারিবারিকভাবে আলোচনা করলে সেখান থেকেও পরিবারের যুবকরা সঠিক পথের নিশানা পাবে; নিজেকেও শুধরাতে চেষ্টা করবে।
পারিবারিকভাবে সুস্থ চিন্তা, শুদ্ধ মননশীলতা তৈরি হতে পারে। যদি প্রত্যেক অভিভাবকগণ সচেতন হন। তাহলে পারিবারিকভাবেও দমন করা সম্ভব। আপনার পরিবারের ঐ যুবকটি তার বন্ধুদের সাথে আলাপ করে নিজেদেরকে শুধরাতে পারবে বলে আমার বিশ্বাস। এভাবেই ক্রমান্বয়ে ধীরে ধীরে বখাটেপনা বন্ধ হতে পারে।
আমি পরিবারের উপরই বেশি জোর দিচ্ছি, কারণ একটা সৃজনশীল সুস্থ ও শুদ্ধ চিন্তার পারিবারিক পরিবেশই একটা সন্তানের ভাবীকালের চাবিকাঠি। কাদাতে পা রাখলে যেমন এর ছাপ বা চিহ্ন অনেকদিন থেকে যায় সেরকম ছোটোবেলা থেকে অভিভাবকরা যদি সন্তানকে ভালো অনুষ্ঠানাদিতে নিয়ে যান, যেখানে কিছু শিক্ষনীয় বিষয় থাকে একটু জ্ঞানরূপ সম্পদ আহরণ করা যাবে সেই সমস্ত অনুষ্ঠানাদিতে নিয়ে যাওয়া উচিত। ঐ সমস্ত অনুষ্ঠানাদির জ্ঞানগুলিই আপনার আমার ভবিষ্যৎ জীবনের পথ চলার পাথেয় হিসাবে কাজ করবে। পরিবারের অভিভাবকগণ যদি ডিসের বিভিন্ন চ্যানেল নিয়ে সস্তা বিনোদনের মধ্যে নিজেকে ব্যাপৃত রাখেন ছেলে মেয়ে বড়ো হলে কোথায় যাচ্ছে, কী করছে সেসব খবর না রাখেন শুধু নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকেন তাহলে তো ছেলেমেয়েরা উচ্ছন্নে যাবেই। পারিবারিক পরিবেশ ছেলে মেয়েদের মন মানসিকতায় অনেক প্রভাব বিস্তার করে।
ছেলেমেয়েরা বড়ো হলে ওদের সাথে বন্ধুর মত অভিভাবককে আচরণ করতে হয়। ছেলেমেয়েরা কোথায় যাচ্ছে, কী করছে বাইরে, তাদের বন্ধু-বান্ধবীরা কী ধরনের সৎ-সঙ্গ করছে, না বখাটেদের সাথে মিশছে এসব অভিভাবকদের খোঁজ-খবর বা তদারকি রাখতে হয়; বিশেষ করে মাকে। গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে রাখলে ছেলেমেয়েরা তো উচ্ছনে যাবেই কারণ বয়সের একটা ধর্ম আছে, ভালোমন্দ বিচার করার ক্ষমতা বা জ্ঞান থাকে না তাই তখন মা-বাবা বা অভিভাবকেই অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে তাদের দায়িত্ব পালন করতে হবে। আচরণ বন্ধুর মত করতে হবে যাতে সন্তানরা সব কিছু বলার মত সাহস পায়। কোন হুমকি-ধমকি বা কড়া শাসনে আটকিয়ে রাখলে চলবে না। এতে আরো বিপরীত ক্রিয়া প্রতিফলিত হবে। কারণ শাসনের তলোয়ারের চেয়ে ভালোবাসার তলোয়ার অনেক শক্তিশালী।
অতি উচ্চশ্রেণির পরিবারবর্গ যারা আছেন দেখা যাচ্ছে মা-বাবারা সারা দিন-রাত মিটিং, ক্লাব বিভিন্ন প্রকার সভা-সমিতি নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। এদিকে ছেলেমেয়েরা একাকীত্ব বোধ করে, মা-বাবার স্নেহ থেকে বঞ্চিত হয়ে এক সময় ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে। উচ্ছন্নে যায়।
সন্তানরা বড়ো হলে মা-বাবাদের উচিত স্বামী-স্ত্রী মধ্যে সংযত ব্যবহার বজায় রেখে চলা, এমন কোনো আচরণ নিজেদের মধ্যে না করা যার দ্বারা সন্তানদের মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়।
আজকাল স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সেপারেশন যেন এক ধরনের প্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেসব পরিবারে সন্তানরাও আদর স্নেহ থেকে বঞ্চিত হয়ে পারিবারিক সুস্থ পরিবেশ নষ্ট হয়ে মন আপনা থেকে বিদ্রোহ ঘোষণা করে, ফলে বিপথে চলে যায়।
বর্তমান যুগ তথ্য প্রযুক্তির যুগ। শিক্ষা-দীক্ষায় বাংলাদেশ বেশ এগিয়ে আছে। প্রতি বছর শত শত ছেলেরা ডিগ্রী নিয়ে বেড়াচ্ছে কিন্তু চাকুরি নেই, বেকার জীবনে মন উদ্বিগ্ন, জীবন যাপন বেপরোয়া হয়ে উঠে, ডিগ্রী নিয়ে বাপের হোটেলে খাওয়া অনেক ছেলেরই কাম্য নয়। ফলে বিপথে যায় এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়। কারণ অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা। কাজের মধ্যে নিজেকে ব্যস্ত রাখলে মনে কু-প্রভাব বিস্তার লাভ করতে পারেনা।

⤵[শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি sylhetnews71live.com.'কে জানাতে ই-মেইল করুন- news.sylhetnews71@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব]
Copyright © Sylhetnews71live.com All rights reserved. | Developed By by Mediaitbd.com.
🔴Share
Facebook

Developed By Mediait